কোরবানির গরু জবেহ করার সঠিক নিয়ম ও সহীহ হাদিস
পবিত্র ঈদুল আজহা বা কোরবানি ইসলামের অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। কোরবানি কবুল হওয়ার জন্য যেমন নিয়ত খাঁটি হওয়া জরুরি, তেমনি সঠিক ও ইসলামী শরিয়ত সম্মত উপায়ে পশু জবেহ করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামে পশুর প্রতি দয়া প্রদর্শন এবং সঠিক পদ্ধতিতে জবেহ করার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে।
নিচে কোরবানির গরু জবেহ করার সম্পূর্ণ নিয়ম এবং এ সংক্রান্ত সহীহ হাদিসসমূহ বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো:
১. জবেহ করার পূর্ব প্রস্তুতি ও পশুর প্রতি দয়া
ইসলামে জবেহের আগে পশুকে কোনো ধরনের অতিরিক্ত কষ্ট না দেওয়ার কঠোর নির্দেশনা রয়েছে।
ছুরি ধারালো করা: জবেহ করার ছুরিটি আগেই খুব ভালো করে ধার দিয়ে নিতে হবে, যাতে পশুটি এক কোপেই সহজে জবেহ হয়ে যায় এবং বেশিক্ষণ ছটফট না করে।
পশুর সামনে ছুরি ধার না দেওয়া: পশুকে শোয়ানোর পর তার চোখের সামনে ছুরি ধার দেওয়া মাকরূহ।
একটি পশুর সামনে অন্য পশু জবেহ না করা: এতে পশুটি অতিরিক্ত ভয় পায়, যা ইসলামের মানবিক শিক্ষার পরিপন্থী।
সহীহ হাদিস: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক বিষয়ে দয়া ও উত্তম আচরণ ফরজ করেছেন। অতএব, তোমরা যখন জবেহ করবে, তখন উত্তম পদ্ধতিতে জবেহ করো। তোমাদের প্রত্যেকে যেন তার ছুরিটি ভালোভাবে ধারালো করে নেয় এবং জবেহকৃত পশুকে শান্ত করে (যাতে সে দ্রুত আরাম পায়)।" (সহীহ মুসলিম, হাদিস নং: ১৯৫৫)
২. গরু শোয়ানো ও জবেহ করার সুন্নাত নিয়ম
১. পশুর মুখ কিবলামুখী করা: গরুকে বাম কাতে (বাম পাশে) শোয়াতে হবে, যাতে গরুর বুক ও মুখ কিবলার দিকে (পশ্চিম দিকে) থাকে এবং যিনি জবেহ করবেন তার মুখও যেন কিবলামুখী হয়। ২. পা বাঁধা: জবেহের সুবিধার্থে গরুর তিনটি পা শক্ত করে বাঁধুন এবং পেছনের ডান পাটি মুক্ত বা হালকা রাখুন, যাতে জবেহ করার পর পশুটি পা নাড়াচাড়া করে শরীর থেকে সহজে সব রক্ত বের করে দিতে পারে। ৩. গর্দান চেপে ধরা: গরুর মাথা ও ঘাড় শক্ত করে চেপে ধরতে হবে যাতে জবেহ করার সময় পশুটি বেশি নড়াচড়া না করতে পারে।
৩. জবেহ করার দোয়া ও তাসমিয়াহ্ (আল্লাহর নাম নেওয়া)
জবেহ করার সময় মুখে আল্লাহর নাম নেওয়া (তাসমিয়াহ্) ফরজ। ইচ্ছাকৃতভাবে আল্লাহর নাম না নিলে সেই পশুর মাংস খাওয়া হালাল হবে না।
মূল দোয়া (যা বলা আবশ্যক): > বড় হরফে: بِسْمِ اللهِ وَاللهُ أَكْبَرُ
উচ্চারণ: বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার। অর্থ: আল্লাহর নামে, আল্লাহ সবচেয়ে মহান।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ অনুযায়ী পূর্ণাঙ্গ দোয়া: যদি সম্ভব হয়, জবেহ করার ঠিক আগে এই দোয়াটি পড়া সুন্নাত:"ইন্নি ওয়াজ্জাহতু ওয়াজহিয়া লিল্লাজি ফাতারাস সামাওয়াতি ওয়াল আরদা হানিফাও ওয়া মা আনা মিনাল মুশরিকিন। ইন্না সালাতি ওয়া নুশুকi ওয়া মাহয়াইয়া ওয়া মামাতি লিল্লাহি রাব্বিল আলামিন। লা শারিকা লাহু ওয়া বি জালিকা উমিরতু ওয়া আনা মিনাল মুসলিমিন। আল্লাহুম্মা মিনকা ওয়া লাকা।" এরপর "বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার" বলে জবেহ করতে হবে।
জবেহ করার পর পড়ার দোয়া: জবেহ শেষ করে বলা সুন্নাত— "আল্লাহুম্মা তাকাব্বালহু মিন্নি" (হে আল্লাহ, আপনি আমার পক্ষ থেকে এটি কবুল করুন)। যদি অন্যের গরু হয়, তবে "মিন্নি"-র জায়গায় সেই ব্যক্তির নাম বলতে হবে।
৪. জবেহর সময় গলার কোন কোন রগ কাটতে হবে?
গরু জবেহ করার সময় গলার সম্মুখভাগের প্রধান ৪টি রগ কাটতে হবে। ৪টি রগ সম্পূর্ণ কেটে যাওয়া উত্তম, তবে অন্তত ৩টি রগ অবশ্যই কাটতে হবে। রগগুলো হলো:
হুলকুম (Hulkum): শ্বাসনালী (যা দিয়ে পশু শ্বাস নেয়)।
মুরি (Muri): খাদ্যনালী (যা দিয়ে খাবার পাকস্থলীতে যায়)।
ওয়াদাজাইন (Wadajain): দুই পাশের দুটি বড় রক্তনালী, যা দিয়ে মস্তিষ্কে রক্ত প্রবাহিত হয়।
বিশেষ সতর্কতা: জবেহ করার সময় খেয়াল রাখতে হবে যেন ছুরি পশুর মেরুদণ্ডের হাড় বা ঘাড়ের ভেতরের মজ্জা (Spinal Cord) পর্যন্ত না পৌঁছায়। মজ্জা কেটে ফেললে পশুর হার্টবিট সাথে সাথে বন্ধ হয়ে যায়, ফলে শরীর থেকে সব দূষিত রক্ত বের হতে পারে না এবং মাংসের মান খারাপ হয়ে যায়।
৫. জবেহ পরবর্তী করণীয় ও সতর্কতা
পুরোপুরি প্রাণ যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা: জবেহ করার পর পশুটি শান্ত হওয়া এবং তার প্রাণ পুরোপুরি বের হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
আগে চামড়া না ছড়ানো: যতক্ষণ না পশুর শরীর পুরোপুরি ঠান্ডা হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত পা কাটা, চামড়া ছড়ানো বা ঘাড় মটকানো যাবে না। এটি অত্যন্ত নিষ্ঠুরতা এবং মাকরূহ।
রক্ত ও বর্জ্য পরিষ্কার করা: জবেহ করার পর ওই স্থানের রক্ত ও বর্জ্য মাটি বা ব্লিচিং পাউডার ও জল দিয়ে দ্রুত পরিষ্কার করে ফেলা উচিত, যাতে পরিবেশ দূষিত না হয় এবং প্রতিবেশীদের কষ্ট না হয়।
উপসংহার: সঠিক নিয়মে কোরবানি করার মাধ্যমে যেমন পশুর কষ্ট কম হয়, তেমনি আল্লাহর দরবারেও সেই কোরবানি কবুল হওয়ার আশা থাকে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে সঠিক নিয়মে কোরবানি করার তৌফিক দান করুন। আমিন।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন