বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় (অধ্যায়-১: ঔপনিবেশিক যুগ ও বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রাম) – পূর্ণাঙ্গ সৃজনশীল ও সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর গাইড 📚✨
আসালামু আলাইকুম বন্ধুরা । আজ আমরা আলোচনা করব অষ্টম শ্রেণীর প্রথম অধ্যায় নিয়ে । সোঁ মুলত আমরা এই অধ্যায়ের সংক্ষিপ্ত ও সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর লেখব ইনশাল্লাহ । আমরা সরাসরি মুল কাজে চলে যাই ।
সৃজনশীল ঃ
১। ভারতে প্রথম ভাইসরয় নিযুক্ত হন কে?
উত্তরঃ ভারতে প্রথম ভাইসরয় নিযুক্ত হন লর্ড ক্যানিং।
১৮৫৮ সালের ভারত শাসন আইন অনুযায়ী ভারতের শাসনভার ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছ থেকে সরাসরি ব্রিটিশ রাজমুকুটের অধীনে চলে যায় এবং তৎকালীন গভর্নর জেনারেল পদটি 'ভাইসরয়' হিসেবে পুনর্নামকরণ করা হয়। লর্ড ক্যানিং ছিলেন ভারতের শেষ গভর্নর জেনারেল এবং প্রথম ভাইসরয়।
২। বাংলা ১১৭৬সনে এ দেশে মারাত্তক দুর্ভিক্ষ দেখা দেয় কেন?
উত্তরঃ বাংলা ১১৭৬ সনে (ইংরেজি ১৭৭০ সাল) বাংলায় যে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছিল, যা 'ছিয়াত্তরের মন্বন্তর' নামে পরিচিত, তার প্রধান কারণগুলো নিচে দেওয়া হলো:
প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও অনাবৃষ্টি: টানা কয়েক বছর বাংলায় পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত না হওয়ায় এবং ১৭৬৯ সালে তীব্র খরা দেখা দেওয়ায় ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয় এবং চরম খাদ্যসংকট সৃষ্টি হয়।
কোম্পানির দ্বৈত শাসন ও রাজস্ব নীতি: পলাশীর যুদ্ধের পর ইংরেজদের 'দ্বৈত শাসন' ব্যবস্থার ফলে কৃষকদের ওপর করের বোঝা অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায়। চরম দুর্ভিক্ষের সময়েও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কর মওকুফ না করে জোরপূর্বক খাজনা আদায় অব্যাহত রাখে।
খাদ্যশস্যের মজুদ ও মুনাফাখোরি: কোম্পানির অসাধু কর্মচারী ও দেশীয় ব্যবসায়ীরা অধিক মুনাফার আশায় চাল ও অন্যান্য খাদ্যশস্য মজুদ করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছিল, যা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যায়।
এই সম্মিলিত কারণেই বাংলার এক-তৃতীয়াংশ মানুষ এই ভয়াবহ দুর্ভিক্ষে প্রাণ হারিয়েছিল।
৩। উদ্দীপকে বর্ণিত পরিস্থিতির মতো উনবিংশ শতাব্দীর বাংলায় কীসের উদ্ভব ঘটেছিল? ব্যাখ্যা করো ।
উত্তরঃ উনবিংশ শতাব্দীতে বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে যে নবজাগরণ বা পরিবর্তনের সূচনা হয়েছিল, তার অন্যতম প্রধান ফলাফল ছিল 'মধ্যবিত্ত শ্রেণি' (Middle Class)-এর উদ্ভব। আপনার উদ্দীপকের পরিস্থিতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে নিচে এর ব্যাখ্যা প্রদান করা হলো:
উনবিংশ শতাব্দীতে বাংলার মধ্যবিত্ত শ্রেণির উদ্ভব
১. প্রেক্ষাপট ও পরিচয়: ব্রিটিশ শাসন আমলে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত (১৭৯৩), ইংরেজি শিক্ষার প্রসার এবং নতুন প্রশাসনিক ব্যবস্থার ফলে বাংলায় একটি নতুন সামাজিক শ্রেণির জন্ম হয়। এই শ্রেণিটি মূলত উচ্চবিত্ত জমিদার এবং নিম্নবিত্ত কৃষক বা শ্রমজীবী মানুষের মাঝামাঝি অবস্থানে ছিল। এদেরই 'মধ্যবিত্ত শ্রেণি' বলা হয়।
২. ইংরেজি শিক্ষার প্রভাব: উনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে লর্ড মেকলের শিক্ষানীতি এবং রাজা রামমোহন রায়ের মতো মনীষীদের প্রচেষ্টায় ইংরেজি শিক্ষার ব্যাপক প্রসার ঘটে। এর ফলে একদল বাঙালি তরুণ পাশ্চাত্য শিক্ষা, বিজ্ঞান এবং যুক্তিবাদী দর্শনে দীক্ষিত হয়। এই শিক্ষিত গোষ্ঠীই মধ্যবিত্ত শ্রেণির মেরুদণ্ড হিসেবে আবির্ভূত হয়।
৩. পেশাগত বৈচিত্র্য: এই নবগঠিত শ্রেণির মানুষরা শুধু কৃষির ওপর নির্ভরশীল ছিলেন না। তারা ব্রিটিশ সরকারের অধীনে সরকারি চাকরি, ওকালতি, ডাক্তারি, শিক্ষকতা এবং সাংবাদিকতার মতো আধুনিক পেশায় যুক্ত হন। অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল হওয়ার পাশাপাশি তারা সামাজিক মর্যাদার অধিকারী হয়ে ওঠেন।
৪. সমাজ সংস্কার ও নবজাগরণ: বাংলার মধ্যবিত্ত শ্রেণিই মূলত ১৯ শতাব্দীর 'বাংলার নবজাগরণ' (Bengal Renaissance)-এর মূল কারিগর ছিল। সতীদাহ প্রথা বিলোপ, বিধবা বিবাহ প্রচলন এবং কুসংস্কারমুক্ত সমাজ গঠনে এই শ্রেণির অবদান অনস্বীকার্য। তাদের হাত ধরেই বাংলায় আধুনিক সাহিত্য, সংবাদপত্র এবং জাতীয়তাবাদী চেতনার বিকাশ ঘটে।
৪। রায়হানার মতো শিক্ষিত নারির জন্যই এদেশে নারি শিক্ষার পথ সুগম হয়েছে, উত্তিটির যথার্থতা নিরূপণ কর।
উত্তরঃ উদ্দীপকের রায়হানার চারিত্রিক দৃঢ়তা এবং শিক্ষার প্রতি অনুরাগ উনবিংশ শতাব্দীতে বাংলার নারী জাগরণের অগ্রদূতদের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। ‘শিক্ষিত নারীর মাধ্যমেই নারী শিক্ষার পথ সুগম হয়েছে’—উক্তিটি অত্যন্ত যথার্থ এবং এর সপক্ষে যুক্তি নিচে উপস্থাপন করা হলো:
শিক্ষিত নারীর মাধ্যমেই নারী শিক্ষার অগ্রযাত্রার যথার্থতা
১. বেগম রোকেয়ার পথপ্রদর্শক ভূমিকা: বাংলার নারী শিক্ষার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় উদাহরণ বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন। তিনি নিজে শিক্ষিত হয়ে উপলব্ধি করেছিলেন যে, সমাজকে এগিয়ে নিতে নারী শিক্ষার বিকল্প নেই। তিনি কেবল ঘরে বসে থাকেননি, বরং দ্বারে দ্বারে ঘুরে ছাত্রী সংগ্রহ করেছেন এবং 'সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল' প্রতিষ্ঠা করেছেন। তার মতো শিক্ষিত নারীর সাহসী পদক্ষেপই এদেশের সাধারণ পরিবারের মেয়েদের স্কুলের আঙিনায় আনার পথ সুগম করেছিল।
২. সামাজিক বাধা অতিক্রম ও উদাহরণ সৃষ্টি: তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজে নারীদের বাড়ির বাইরে যাওয়া বা পড়ালেখা করা ছিল অকল্পনীয়। রায়হানার মতো শিক্ষিত নারীরা যখন নিজেরা শিক্ষিত হয়ে সাফল্যের পরিচয় দিয়েছেন, তখন তারা সমাজের সামনে একটি ইতিবাচক উদাহরণ (Role Model) হিসেবে দাঁড়িয়েছেন। তাদের সাফল্য দেখে অন্য অভিভাবকরাও তাদের কন্যা সন্তানদের শিক্ষিত করতে উৎসাহিত হয়েছেন।
৩. সচেতনতা বৃদ্ধি ও মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন: একজন শিক্ষিত নারী যখন পরিবার ও সমাজ পরিচালনা করেন, তখন তার চিন্তা-চেতনায় আধুনিকতা ও অধিকারবোধ কাজ করে। শিক্ষিত নারীরাই প্রথম বুঝতে পেরেছিলেন যে, মুক্তি কেবল পুরুষের দয়ায় নয়, বরং নিজেদের শিক্ষার মাধ্যমে অর্জন করতে হবে। এই সচেতনতা তারা পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছেন, যা নারী শিক্ষার পথকে চিরস্থায়ী ভিত্তি দিয়েছে।
৪. প্রাতিষ্ঠানিক ও সাংগঠনিক প্রচেষ্টা: উনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীতে ফয়জুন্নেসা চৌধুরানী বা স্বর্ণকুমারী দেবীর মতো শিক্ষিত নারীরা বিভিন্ন সভা-সমিতি ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন। তারা লেখনীর মাধ্যমে নারী শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা প্রচার করেছেন। শিক্ষিত নারীরাই যদি এসব উদ্যোগ না নিতেন, তবে কেবল সরকারি বা পুরুষদের প্রচেষ্টায় নারী শিক্ষা আজকের অবস্থানে পৌঁছাত না।
সংক্ষিপ্তঃ
১/ ইংরেজ শাসনকে ঔপনিবেশিক শাসন বলা হয় কেন?
উত্তর ঃ ইংরেজ শাসনকে ঔপনিবেশিক শাসন বলা হয় কারণ ব্রিটিশরা এদেশ শাসন করেছিল মূলত তাদের নিজেদের দেশের (যুক্তরাজ্যের) অর্থনৈতিক স্বার্থ হাসিল করার জন্য। নিচে এর দুটি প্রধান কারণ উল্লেখ করা হলো:
১. সম্পদ পাচার: ইংরেজরা এদেশের শাসন ক্ষমতা দখল করে এখানকার কাঁচামাল ও অর্থ নিজেদের দেশে পাচার করত। তাদের শাসনের মূল উদ্দেশ্য জনকল্যাণ নয়, বরং শোষণ ও লুণ্ঠনের মাধ্যমে নিজ দেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করা ছিল।
২. বিদেশি নিয়ন্ত্রণ: ঔপনিবেশিক শাসনের নিয়ম অনুযায়ী, একটি দেশ অন্য একটি দেশের ওপর কর্তৃত্ব স্থাপন করে কিন্তু তারা কখনো স্থানীয় জনগণের সাথে মিশে যায় না। ব্রিটিশরা প্রায় ১৯০ বছর ভারত শাসন করলেও তারা এদেশকে নিজেদের মাতৃভূমি হিসেবে গ্রহণ করেনি, বরং দূর থেকে একটি ‘কলোনি’ বা উপনিবেশ হিসেবে নিয়ন্ত্রণ করেছে।
২। বাংলায় ইংরেজ শাসন প্রতিষ্ঠার দুইটি কারন ব্যাখ্যা কর।
উত্তরঃ বাংলায় ইংরেজ শাসন প্রতিষ্ঠার প্রধান দুটি কারণ নিচে ব্যাখ্যা করা হলো:
১. বাংলার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি: তৎকালীন সময়ে বাংলা ছিল ধন-সম্পদে পরিপূর্ণ এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রধান কেন্দ্র। বাংলার মসলিন, রেশম এবং মশলার প্রতি ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির তীব্র আকর্ষণ ছিল। এই বাণিজ্যিক সুবিধা একচেটিয়াভাবে ভোগ করার লালসা এবং এদেশের সম্পদ লুণ্ঠনের উদ্দেশ্যই তাদের শাসন প্রতিষ্ঠায় উদ্বুদ্ধ করেছিল।
২. রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ষড়যন্ত্র: নবাব আলীবর্দী খাঁর মৃত্যুর পর বাংলার রাজনীতিতে চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। তরুণ নবাব সিরাজউদ্দৌলার বিরুদ্ধে তাঁর পরিবারের সদস্য (ঘষেটি বেগম) এবং প্রভাবশালী আমাত্যদের (মীর জাফর, উমিচাঁদ, রাজবল্লভ) ষড়যন্ত্র শুরু হয়। ইংরেজরা এই অভ্যন্তরীণ অনৈক্যের সুযোগ নিয়ে ষড়যন্ত্রকারীদের সাথে হাত মেলায়, যা পলাশীর যুদ্ধে নবাবের পরাজয় ও ইংরেজ শাসনের পথ প্রশস্ত করে।
৩। দ্বৈত শাসন প্রবর্তনের ফলে নবাব কেন ক্ষমতাহীন হয়ে পরেন? ব্যাখ্যা করো ।
উত্তরঃ ১৭৬৫ সালে লর্ড ক্লাইভ প্রবর্তিত দ্বৈত শাসন ব্যবস্থার ফলে নবাব মূলত একটি অলঙ্কারিক বা নামমাত্র শাসকে পরিণত হন। এর প্রধান দুটি কারণ হলো:
১. রাজস্ব ও অর্থবল হারানো: এই ব্যবস্থার মাধ্যমে ইংরেজরা বাংলার ‘দেওয়ানি’ বা রাজস্ব আদায়ের পূর্ণ ক্ষমতা লাভ করে। ফলে রাষ্ট্রের সমস্ত অর্থ ইংরেজদের হাতে চলে যায় এবং নবাব সম্পূর্ণভাবে তাদের মাসিক ভাতার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। অর্থ ছাড়া শাসন কাজ পরিচালনা করা নবাবের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়ে।
২. দায়িত্বহীন ক্ষমতা বনাম ক্ষমতাহীন দায়িত্ব: দ্বৈত শাসনের ফলে ইংরেজরা লাভ করে ‘দায়িত্বহীন ক্ষমতা’ (অর্থাৎ তারা টাকা আদায় করবে কিন্তু শাসনের দায় নেবে না), আর নবাবের ওপর বর্তায় ‘ক্ষমতাহীন দায়িত্ব’। নবাবকে বিচার ও আইন-শৃঙ্খলার দায়িত্ব দেওয়া হলেও তা পালনের জন্য প্রয়োজনীয় সৈন্যবল বা অর্থ তাঁর ছিল না। ফলে তিনি কার্যত ক্ষমতাহীন হয়ে পড়েন।
৪। ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের কারণ ব্যাখ্যা করো ।
উত্তরঃ ১৭৭০ সালে (বাংলা ১১৭৬ সনে) বাংলায় যে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ হয়েছিল, তাকে ছিয়াত্তরের মন্বন্তর বলা হয়। এর প্রধান দুটি কারণ নিচে দেওয়া হলো:
১. প্রাকৃতিক বিপর্যয় (অনাবৃষ্টি): ১৭৬৮ ও ১৭৬৯ সালে বাংলায় টানা অনাবৃষ্টির কারণে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয় এবং চরম খরা দেখা দেয়। এতে কৃষিশস্য উৎপাদন প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাজারে খাদ্যের তীব্র অভাব দেখা দেয়।
২. দ্বৈত শাসনের শোষণ: লর্ড ক্লাইভ প্রবর্তিত দ্বৈত শাসন ব্যবস্থার অধীনে ইংরেজরা অতিরিক্ত রাজস্ব আদায়ের চাপে কৃষকদের জর্জরিত করে তোলে। দুর্ভিক্ষের সময়ও কোম্পানি কর মওকুফ করেনি, বরং মজুদদারি ও দুর্নীতির মাধ্যমে খাদ্যের কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছিল, যা সাধারণ মানুষের টিকে থাকা অসম্ভব করে তোলে।
সো বন্ধুরা আজ আমরা তোমাদের প্রথম অধ্যায় শেষ করলাম । ইনশাল্লাহ এটাতে ভালো সারা পেলে ভবিষ্যতে এমনে ভালো ও নির্ভুল উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করব । আর এটা যদি তোমাদের উপকারে আসে তাহলে একটা কমেন্ট ও ফলো দিও ধন্যবাদ ।

ধন্যবাদ ভাইয়া অনেক উপকার হলো ।
উত্তরমুছুনthanks
উত্তরমুছুন